গাইড

সোনার হলমার্ক কী — ৯১৬, ৮৭৫, ৭৫০ মানে কী বোঝায়?

গহনায় ছোট্ট একটা সংখ্যা — ৯১৬ বা ৭৫০ — এই সংখ্যাগুলোর মানে না জানলে ঠকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। হলমার্ক কীভাবে পড়বেন, কোথায় দেখবেন, আর নকল হলমার্ক চেনার উপায় জানুন।

একটা সত্যিকারের ঘটনা দিয়ে শুরু করি। ঢাকার একটি পরিবার বিয়ের জন্য প্রায় পাঁচ লাখ টাকার সোনা কিনেছিল। বছরখানেক পরে ব্যাংকে লোনের জন্য সেই সোনা মূল্যায়ন করাতে গেলে দেখা গেল — গহনায় হলমার্ক নেই, এবং পরীক্ষায় প্রমাণিত হলো সোনা ২২ ক্যারেটের বদলে ১৮ ক্যারেট।

এই রকম ঘটনা বাংলাদেশে নতুন না। কিন্তু হলমার্ক সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান থাকলে এই ফাঁদে পড়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়।

হলমার্ক আসলে কী?

হলমার্ক হলো সোনার বিশুদ্ধতার সরকারি বা স্বীকৃত সংস্থার সিলমোহর। এটা গহনার উপর ছোট করে খোদাই করা থাকে — সাধারণত ভেতরের দিকে, কানের দুলের ক্ষেত্রে পিনের কাছে, আংটিতে ভেতরের বাঁকে।

হলমার্কের সংখ্যাটা আসলে প্রতি হাজার ভাগে কতটুকু খাঁটি সোনা আছে সেটা বোঝায়।

হলমার্কক্যারেটবিশুদ্ধতামানে
৯৯৯২৪ ক্যারেট৯৯.৯%প্রায় খাঁটি, গহনায় সাধারণত ব্যবহার হয় না
৯১৬২২ ক্যারেট৯১.৬%বাংলাদেশে সবচেয়ে প্রচলিত
৮৭৫২১ ক্যারেট৮৭.৫%মধ্যপ্রাচ্যে বেশি দেখা যায়
৭৫০১৮ ক্যারেট৭৫%ডিজাইনার ও ডায়মন্ড গহনায়
৫৮৫১৪ ক্যারেট৫৮.৫%বাংলাদেশে বিরল

গহনায় হলমার্ক কোথায় খুঁজবেন?

হলমার্ক সবসময় অদৃশ্য জায়গায় থাকে — যেন দেখতে বিশ্রী না লাগে। কিন্তু চাইলেই দেখা যায়।

আংটিতে: ভেতরের বাঁকে, নিচের দিকে খুঁজুন। চুড়িতে: একপাশের বাঁকে, সাধারণত ক্লোজারের কাছে। কানের দুলে: পিনের গোড়ায় বা ব্যাক প্লেটে। হারে: লকেটের পেছনে বা চেইনের ক্লাসপের কাছে। মাথার গহনায়: পেছনের দিকে, কম দেখার জায়গায়।

গহনা কেনার সময় দোকানদারকে বলুন একটা ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিতে — হলমার্ক খুব ছোট হয়, খালি চোখে পড়া কঠিন।

নকল হলমার্ক চেনা যায় কীভাবে?

এটাই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন। নকল হলমার্ক বাইরে থেকে দেখে ধরা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু কিছু লক্ষণ আছে —

অস্পষ্ট বা অসম্পূর্ণ সংখ্যা: আসল হলমার্ক পরিষ্কার ও স্পষ্ট হয়। ঘোলা বা আধা-মোছা মনে হলে সন্দেহজনক। সংখ্যার বদলে অক্ষর: বাংলাদেশে কিছু দোকান 'KT' বা 'K' লিখে রাখে — এটা হলমার্ক না, শুধু দোকানের দাবি। খুব সহজে ঘষে উঠে যাওয়া: আসল হলমার্ক গহনার মধ্যে খোদাই করা, আলাদা করে লাগানো না।

নিশ্চিত হতে চাইলে একমাত্র উপায় হলো পরীক্ষাগারে পাঠানো। ঢাকায় কিছু সরকারি ও বেসরকারি ল্যাব আছে যেখানে XRF (X-Ray Fluorescence) পদ্ধতিতে সোনার বিশুদ্ধতা পরীক্ষা করা যায়।

বাংলাদেশে হলমার্ক বাধ্যতামূলক কিনা?

এখানেই একটা সমস্যা। বাংলাদেশে এখনো সোনার হলমার্ক পুরোপুরি বাধ্যতামূলক নয়। বাজুস (বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি) হলমার্ক নিশ্চিত করার চেষ্টা করে, কিন্তু আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় অনেক দোকান এখনো বিনা হলমার্কে গহনা বিক্রি করে।

ভারতে ২০২১ সাল থেকে হলমার্ক বাধ্যতামূলক হয়েছে। বাংলাদেশেও এই নিয়ম আসার কথা বলা হচ্ছে বেশ কয়েক বছর ধরে, কিন্তু এখনো কার্যকর হয়নি।

এই বাস্তবতায় ক্রেতার নিজের সতর্কতাই একমাত্র রক্ষা।

হলমার্ক না থাকলে কী করবেন?

হলমার্ক না থাকলে সেই গহনা কিনবেন না — এটাই সহজ সমাধান। কিন্তু পরিবারের পুরনো গহনা বা উপহারের ক্ষেত্রে হলমার্ক না থাকলে?

সেক্ষেত্রে যেকোনো বিশ্বস্ত জুয়েলারে গিয়ে পরীক্ষা করিয়ে নিন। বেশিরভাগ ভালো দোকানে অ্যাসিড টেস্টের ব্যবস্থা থাকে — খুব অল্প খরচে বা বিনামূল্যে করা যায়।

মনে রাখবেন, কেনার সময় সঠিক ক্যারেটের গহনা না পেলে পরে বিক্রি বা বিনিময়ের সময় বড় ক্ষতি হয়। পাকা পরতা ক্যালকুলেটর দিয়ে দেখুন ২২ এবং ১৮ ক্যারেটের দামের পার্থক্য কতটা।

← সব নিবন্ধ লেখক: DeshiGoldPrice সম্পাদনা দল